Ichamati-2Miscellaneous 

টাকিতে একদিন

টোটো চালক আমাকে ও আমার গাড়ির চালক রাম শর্মাকে ওর দু-পাশের আসনে বসিয়ে দিল। টোটো চালক প্রথমে আমাদের টাকির আকর্ষণীয় স্থান গোলপাতার জঙ্গল বা মিনি সুন্দরবন যাওয়ার পথে দেখিয়ে দিল টাকি পুরসভা, টাকির গভঃ স্পন্সরড কলেজ ও বিদ্যালয় বিভিন্ন পিকনিক ও ট্যুরিস্ট স্পষ্ট এবং পুরনো নলকূপ (বৃটিশ আমলে তৈরি) যেখান থেকে এক সময় পানীয় জল সরবরাহ করা হত। এরপর আমরা চলে এলাম গোলপাতার জঙ্গলে। এটি ইছামতী নদীর পাড়ে মনুষ্য নির্মিত ছোট ম্যানগ্রোভ অরণ্য। এখানে BSF Camp-এ আমাদের পরিচিতি পত্র জমা রেখে ও টিকিট সংগ্রহ করে একটি কংক্রিটের সেতু পেরিয়ে অরণ্যের মধ্যে চলে এলাম।

জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে প্রাণ ভরে মিনি সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। অরণ্য পথ দিয়ে চলতে চলতে দেখলাম ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল। জঙ্গলের ভিতরে বিশ্রাম গৃহে খানিকক্ষণ বসার পর ভিতরের কাঁচা রাস্তা দিয়ে হেঁটে এগিয়ে গেলাম ইছামতী নদীর তীরে। এখানে বনভূমি শেষ হয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করলাম ইছামতী নদীর বিস্তীর্ণ রূপ। মিনি সুন্দরবন দেখার পর টোটো চালক আমাদের দেখাতে নিয়ে এল ইছামতী নদীর পাড়ে শহরের উত্তর দিকে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরির পৈতৃক বাড়ি। পুরনো দিনের বাড়ি। এখানে রয়েছে দুর্গা দালান, বংশের কূলপুরোহিতের স্মৃতি ফলক।

টোটো চালক আমাদের বলল টাকি একসময় ছিল জমিদারের শহর। এখনও টাকির চারপাশে বিভিন্ন জমিদার বাড়ির ভগ্নাবশেষ অতীত ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। এখন আপনাদের দেখাব একটি জমিদার বাড়ি যা পুবের নামে পরিচিত। এখানে বাইরে থেকে দেখলাম জমিদার বাড়ি ও দুর্গা দালান কারণ দুর্গাপূজার সময় ব্যতীত এখানে প্রবেশ করা যায় না। এরপর আমরা দেখলাম পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলির ‘বিসর্জন’ সিনেমার শ্যুটিং-এর বাড়িটি। এরপর দেখলাম প্রায় ভগ্নদশাপ্রাপ্ত টাকি রাজবাড়ি। এখানে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিলাম অতীত গরিমায়। টোটোয় উঠে বসার পর আমাদের বলল এবার আমরা যাব ইকো ট্যুরিজম পার্ক। এখন আমরা চলেছি মানসিংহ রোড ধরে। এই রাস্তা দিয়ে রাজা মানসিংহ এসেছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে। লক্ষ্য করলাম রাস্তার পাশে একটি হোর্ডিংয়ে একই কথা লেখা রয়েছে।

ইকো ট্যুরিজম পার্কে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পাখি, দোলনা, বোটিংয়ের বন্দোবস্ত এবং রয়েছে ট্যুরিস্টদের জন্য রিসর্ট। এরপর আমরা চলে এলাম টাকির জোড়া মন্দিরে। এই জোড়া শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন টাকির জমিদার গোপীনাথ রায়চৌধুরি। তিনি এখানে একটি পুকুরও খনন করান। আমাদের পরের গন্তব্য ছিল কুলেশ্বরী কালীমন্দির। ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত মন্দিরটি প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো। এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় প্রতাপাদিত্যের আমলে। প্রত্যেক বছর কালীপূজা ও চৈত্র মাসের গাজন উৎসবের দিন এখানে বহু মানুষের সমাগম ঘটে।

একদিনের টাকি ভ্রমণের আমাদের সর্বশেষ গন্তব্য ছিল টাকি রামকৃষ্ণ মিশন। এখানে এসে বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের সঙ্গে হৈহুল্লোড় ও মহারাজদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত করে আমরা ফিরে এলাম রাজবাড়ি ঘাটে। টোটো চালকের ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে গাড়িতে উঠে বসার পূর্বে বৈকালিক জলযোগ সম্পন্ন করে টাকি শহরকে বিদায় জানিয়ে ফিরে চললাম নিজ বাসভবনে। (সমাপ্ত) (ছবি – সংগৃহীত)
সৌঃ- ভ্রমণপিপাসু / লেখক – অনুপম মজুমদার

Related posts

Leave a Comment