রক্তদান আন্দোলনের রূপরেখা
“রক্তের প্রয়োজন জীবনের তরে
রক্তদাতা তৈরি হোক প্রতিটি ঘরে ঘরে।”
স্বেচ্ছায় রক্তদানে যুব-ছাত্রদের যোগদান রক্তদান আন্দোলনের রূপরেখা। বিজ্ঞান প্রযুক্তির যুগে রক্ত উৎপাদিত হয় না। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং রক্তদান ব্লাডব্যাঙ্ক সমূহ রক্ত যোগানের মূল ভিত্তি। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে রক্তদান হতো, রক্তদান শিবির কম হতো, দাতার সংখ্যা নগন্য। মহিলারা সচেতনতার অভাবে রক্ত দিতে এগিয়ে আসতেন না। কিন্তু অঞ্চলের যিনি রক্ত দিতেন তাঁর সম্পর্কে প্রতিবেশীরা উচ্ছ্বসিত প্রশংসিত করতেন।
ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত প্রথম ব্লাডব্যাঙ্কের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে, কলকাতাই এ বিষয়ে প্রথম পথ প্রদর্শক। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে প্রথম ব্লাডব্যাঙ্ক চালু হওয়ার তাঁর ঠিক দু-বছর পর ১৯৩৯ সালে আরও দুটি ব্লাডব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি ইংল্যান্ডে ও অন্যটি ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষের ব্লাড ব্যাঙ্কটি প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ভারতে প্রথম ব্লাডব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠায় পথপ্রদর্শক ছিলেন ডাঃ উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী। তিনি তখন অবিভক্ত বাংলার রেডক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান। ১৯২৫-১৯৪২ বিশ্বের অন্যত্র রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা অনেকটাই অগ্রসর, রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থাকে নিরাপদ করার স্বার্থে উন্নত দেশগুলি যখন গ্রুপ নির্ণয় করে রক্তগ্রহীতার শরীরে সঠিক রক্ত সঞ্চালন শুরু হয়েছে, তখনও কলকাতার স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে প্রতি মাসে মাত্র ৫-৬ জন রোগীকে সরাসরি রক্তদাতার শরীর থেকে রক্ত সঞ্চালন করা হত। এই রোগীদের অধিকাংশই ছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতাল যা আজ এসএসকেএম হাসপাতাল নামে খ্যাত। এজন্য রক্তদাতাকে নগৎ অর্থ প্রদান করা হত।
১৯৪৬ সালে সেপ্টেম্বর থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ পর্যায় অবিভক্ত বাংলার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা করতে পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু কলকাতায় আসেন। তিনি ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে জানতে পারেন যে, ব্রিটিশ সরকার ব্লাডব্যাঙ্কটিকে জনগণের ব্যবহারের জন্য কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের হাতে তুলে দিয়েছেন। ব্লাডব্যাঙ্ক রক্তদান সম্পর্কে নেহেরুর কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু তাঁর প্রবল ইচ্ছা ছিল জনগণের জন্য রক্ত দেবেন। ডাক্তার রায়ের কাছে তিনি সেই ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ডাক্তার রায় পরের দিন ব্লাডব্যাঙ্কের প্রথম অধিকর্তা ডাক্তার ডি এন চ্যাটার্জি ও মেডিক্যাল অফিসার এ সি সেন-কে তাঁর বাসভবনে আমন্ত্রণ জানান এবং পন্ডিতজির রক্তদানের ইচ্ছাকে পূরণ করতে অনুরোধ করেন। ওইদিন সকালে ডাক্তার রায়ের বাসভবনে ডাক্তার চ্যাটার্জি ও ডাক্তার সেনের উপস্থিতিতে পন্ডিত নেহেরুর রক্ত নেওয়া হয়। পন্ডিত নেহেরুর এই স্বেচ্ছায় রক্তদান কলকাতায় ব্লাডব্যাঙ্কের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ও চিরন্তন প্রেরণাদায়ী ঘটনা।
স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও মানুষকে রক্তদানে সচেতনতা কর্মসূচি বজায় রাখতে হয়। পূর্বে শারদ উৎসব, নির্বাচন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, গ্রীষ্মকাল সময়ে স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরের সংখ্যা কম হত। বর্তমানে সারাবছর প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত সংগ্রহ না হওয়ায় চিকিৎসারত রোগীরা সময়মত রক্ত পাচ্ছেন না। বর্তমানে ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়স ও ৪৫ কেজি ওজন এবং চিকিৎসকদের অনুমতি সাপেক্ষে রক্তদাতা তিন মাস অন্তর বছরে চারবার রক্ত দিতে পারে।
বিজ্ঞানের যুগে একজন মানুষ রক্ত দিলে চারজন রোগী রক্ত পায়। বিশেষ করে প্লাজমা, প্লেটলেট, ক্রায়ো, আর বি সি রক্তের উপাদান বিভক্ত করা হয়। যিনি রক্তদাতা তাঁর রক্তে এইচ আই ভি, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, সিফিলিস ও ম্যালেরিয়ার পরীক্ষা করা হয়। যেকোনও ঋতুতে রক্তদান করা যায় । স্যাটেলাইট, কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক্সের যুগে হাতে থাকা মোবাইল, ল্যাপটপ প্রস্তুতকারক বিজ্ঞানী রক্ত আবিষ্কার করতে পারেননি। আপনার আমার ঘরের ছেলে-মেয়েরা স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে বাঁচাচ্ছেন। বাংলায় কলকাতায় বিভিন্ন রাজ্যে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিকরা থাকেন তাঁদের প্রয়োজনে আপনাকে এগিয়ে যেতে হয়। মহিলাদের কাছে অনুরোধ, প্রাকৃতিক নিয়মে আপনাদের রক্তপাত হয়। সুস্থ শরীরে আরও বেশি সংখ্যায় এগিয়ে আসুন। বাঁচান থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া শিশু, হার্টের অপারেশন, কিডনি সংক্রান্ত অসুস্থতা, দুর্ঘটনায় আক্রান্ত মানুষ, গর্ভবতী মা, রক্তজনিত বিভিন্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত বিভিন্ন রোগীদের।
আমি ডি.আশিস সম্পাদক মেডিক্যাল ব্যাঙ্ক, আমার অনুরোধ ভারতবর্ষ এক বৈচিত্র্যময় দেশ। জাতি, ধর্ম, দেশ-ভাষা, বর্ণের উর্দ্ধে গিয়ে তার অবস্থান ভারতবর্ষের গণতন্ত্রে বিভিন্ন দলমত বিদ্যমান। আপনি একজন ভারতবাসীরূপে আরেকজন অসুস্থ ভারতবাসীকে রক্তের বিনিময়ে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন। কুসংস্কার অবৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনার শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে সক্রিয়ভাবে রক্তদানে নিজেকে যুক্ত করুন। মনে রাখবেন, কিছু মানুষ এবং কিছু প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরকে বাণিজ্যিকী করুন করেছে। পুরস্কার প্রথা চালু করার ফলে রক্তদান তার গরিমা হারিয়েছে। রক্তদান শিবির হচ্ছে কিন্তু বড় প্রাণের অভাব। আমি একজন স্বেচ্ছায় রক্তদান আন্দোলনের কর্মীরূপে মনেকরি, রক্তদান করে মানুষের জীবন বাঁচানোই শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। এর থেকে বড় পুরস্কার হয় না। স্বেচ্ছায় রক্তদাতারা কিছুদিনের মধ্যেই ডোনার কার্ড এবং ব্লাড গ্রুপ কার্ড পাবেন, যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং অপরকে রক্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে এটা সংগ্রহ করা উচিত। তাই আসুন আমরা প্রত্যেকে স্লোগান তুলি সহস্রকণ্ঠে যাতে বলতে পারি-
“মহামানব নাইবা হলাম
করতে পারি মহান কাজ
আরেকজনের প্রাণ বাঁচাতে
দেব নিজের রক্ত আজ। “
বিশেষ কৃতজ্ঞতা : ডি. আশিস
সম্পাদক মেডিক্যাল ব্যাঙ্ক

